সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে দেশব্যাপী আলোচিত র্যাবের সাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো: সারওয়ার আলমকে সিলেট জেলা প্রশাসক হিসাবে পদায়ন করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সোমবার (১৮ আগস্ট) প্রজ্ঞাপন জারি করে মো: সারওয়ার আলমকে সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। তিনি এর আগে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন।
বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) সিলেট জেলা প্রশাসক হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মো: সারওয়ার আলম। দুর্নীতিবাজদের মধ্যে এক সময়ের আতঙ্ক সেই সারওয়ার আলম এবার কঠিন সময়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেছেন। সাদা পাথর কাণ্ডে যেখানে প্রশাসনের ‘আপ টু বটম’ জড়িত থাকার অভিযোগ, সেখানে জেলার শীর্ষ পদের দায়িত্ব কতটা কঠোরভাবে পালন করবেন সেটাই এখন সবচেয়ে বড় এবং প্রথম চ্যালেঞ্জ। এছাড়া জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাও তার সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে একজন সৎ, যোগ্য ও কর্মতৎপর জেলা প্রশাসক সিলেটে যোগদান করার খবরে সিলেট জেলা শহর থেকে প্রায় একশত কিলোমিটার দূরবর্তী উপজেলা সীমান্ত জনপদ জকিগঞ্জবাসীর অনেক প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে। জকিগঞ্জ উপজেলার মানচিত্র রক্ষায় নদী ভাঙন প্রতিরোধ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধ করণ, জকিগঞ্জ-শেওলা সড়ক সহ এলজিইডি’র উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামীণ ক্ষতবিক্ষত রাস্তা মেরামত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নানামুখী সমস্যার সমাধান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকট নিরসন, উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে জনবল নিয়োগ, সরকারি দপ্তর থেকে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বন্ধকরণ, সরকারি খাল-নালার দখল উদ্ধার, খাসজমি উদ্ধার, বন্ধ থাকা প্রায় তিনশত কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত রহিমপুর পাম্প হাউস চালু, জকিগঞ্জ কাস্টমস ঘাট নির্মাণ, শুষ্কস্টেশনের ভবন নির্মাণ, আমলশীদ তিন নদীর মোহনাকে পর্যটন স্পট হিসেবে রূপান্তরিত করা, অর্পিত সম্পত্তি (খ) তফসিলভুক্ত বিনিময় মামলা নিষ্পত্তি করা, ঘনঘন সড়ক দূর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রদক্ষেপ গ্রহণসহ বেশ কিছু দাবি পূরণের প্রত্যাশা জকিগঞ্জবাসীর।
জকিগঞ্জের অনেকে জানান, নবাগত জেলা প্রশাসক মো: সারওয়ার আলম একজন সৎ ও কর্মতৎপর ব্যক্তি বলে দেশব্যাপী পরিচিত। তাঁর মতো একজন ভালো প্রশাসক পাওয়ায় আমাদের অবহেলিত জকিগঞ্জের মানুষের অনেক প্রত্যাশা দেখা দিয়েছে। জেলার সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি চাইলে এখন অনেক কিছুই করতে পারবেন। কেননা এখন এমপি, মন্ত্রী, উপজেলা চেয়ারম্যান ও মেয়র কাউন্সিলর সহ গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রতিনিধি নেই। সে কারণে একজন কর্মতৎপর জেলা প্রশাসক চাইলে অনেক কিছুই করতে পারেন। বিগত ১৭ বছরে জকিগঞ্জ উপজেলায় তেমন কোন উন্নয়নের ছোঁয়া না লাগায় সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলের বাসিন্দারা নানা সমস্যায় জর্জরিত বলেও দাবি করেন এলাকার লোকজন। এলাকাবাসী নিম্নবর্ণিত সমস্যার জন্য নবাগত জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাদের প্রত্যাশা ক্লিন ইমেজের জেলা প্রশাসক মো: সারওয়ার আলম চাইলে অতি অল্প সময়ে এসব সমস্যার অনেক কিছু সমাধান করে দিতে পারেন। সমস্যা সমূহ হচ্ছে-
নদী ভাঙ্গন:
সুরমা-কুশিয়ারার ভাঙনে প্রতি বছর ঘর-বাড়ি, স্কুল-মাদ্রাসা, রাস্তা-ঘাট, গোরস্থান, মসজিদ-মন্দির, বাজার সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা চলে যাচ্ছে নদী গর্ভে। বিশেষ করে কুশিয়ারা নদীর ভাঙনের ফলে বাংলাদেশের মানচিত্র ছোট হচ্ছে। বিনা যুদ্ধে প্রতিবছর ভারত নিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের শতশত একর জমি। পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রতি বছর এসব ভাঙন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা বরাদ্ধ নিয়ে আসলেও টেকসই এবং দৃশ্যমান কোন কাজ করেনি বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা এখন নদী পারের মানুষের মুখে মুখে।
যোগাযোগ:
যোগাযোগ ক্ষেত্রে নানাভাবে পিছিয়ে রয়েছেন জকিগঞ্জবাসী। শেওলা-জকিগঞ্জ সড়ক সহ উপজেলার প্রতিটি এলজিইডি সড়ক ক্ষতবিক্ষত। উপজেলার প্রধান প্রধান সড়কে গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ইউনিয়ন ও গ্রামীণ পাকা রাস্তাগুলোর কোথাও কোথাও পাকার রাস্তার অস্তিত্ব খোঁজে পাওয়া মুশকিল। কার্পেটিং উঠে সেই আগের মতো কাঁচা রাস্তা হয়ে গেছে অনেক ইউনিয়ন ও গ্রামীণ সড়কে। প্রায় এক যুগ থেকে এসব রাস্তা ঘাটের কোন মেরামত হয়নি এমনটাই অভিযোগ স্থানীয় এলাকাবাসীর।
সড়ক দুর্ঘটনা:
রাস্তা-ঘাটের এমন বেহাল দশার কারণে প্রতিদিনই দূর্ঘটনা ঘটছে। এতে মানুষের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে। পঙ্গু হয়ে কেউ বাড়িতে আবার কেউ হাসপাতালে কাতরাচ্ছে।
শিক্ষা:
শিক্ষা ক্ষেত্রে সব সময়েই পিছিয়ে রয়েছে জেলা শহর থেকে প্রায় শতকিলোমিটার দূরবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলা। প্রান্তিক এ জনপদে নেই কোন ভালো মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একমাত্র সরকারি কলেজে এখনো পূর্ণাঙ্গ অনার্স কোর্স চালু হয়নি। প্রিন্সিপাল পদে পদায়ন করা হলেও জেলা শহর থেকে দূরবর্তী উপজেলা হওয়ায় বছরের বেশীরভাগ সময় ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল দিতে চলে কলেজের কার্যক্রম। উপজেলায় নেই কোন কারিগরি শিক্ষার উচ্চ প্রতিষ্ঠান।
স্বাস্থ্যসেবা:
স্বাস্থ্য সেবা বলতে জকিগঞ্জ উপজেলা সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছাড়া বিকল্প কোন ব্যবস্থা নেই। সীমান্তবর্তী জনপদ জকিগঞ্জ এবং কানাইঘাট উপজেলার একটি অংশের একমাত্র ভরসাস্থল এটি। কিন্তু এখানেও নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মানসম্পন্ন চিকিৎসা সেবা। ৫০ শয্যায় হাসপাতালটি উন্নতি করণ করা হলেও জনবল সংকটের দোহাই দিয়ে সেই পূরণো ৩১ শয্যা হাসপাতালে গাদাগাদি করে চলছে চিকিৎসা সেবা। হাসপাতালে নতুন একটি ভবন নির্মাণের একযুগ পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালের কার্যক্রম চালু হয়নি আজও।
জনবল সংকট:
জকিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের নেই কর্মকর্তা-কর্মচারী। ভারপ্রাপ্ত আর অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে জোড়াতালিতে চলছে এসব দপ্তর। জনপ্রতিনিধি ও নির্বাচিত সরকার না থাকায় বিভিন্ন দপ্তরে চলছে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের মহোৎসব। এসবের লাগাম টেনে ধরা না হলে জনভোগান্তি ও হয়রানী থামবেনা।
খাল-নালা উদ্ধার:
উপজেলার বিভিন্ন খাল-নালা প্রভাবশালীরা দখল করে বন্ধ করে দেয়ায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও বন্যার সৃষ্টি হয়। দ্রুত এসব সরকারী খাল-নালা প্রভাবশালীদের থেকে দখল মুক্ত করা প্রয়োজন। উপজেলার চৌধুরীর বাজার সহ বিভিন্ন বাজারে নদীর উপর গড়ে উঠেছে দোকান পাঠ। এসব দখলমুক্ত করা না গেলে পরিবেশ বিপর্যয়ে পড়বে। জকিগঞ্জের কাজলসার ইউনিয়নের কুলনদী মৎস্য অভায়াশ্রম ধ্বংস হয়ে যাবে।
খাসজমি উদ্ধার:
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি খাস জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে বাড়ি ঘর, দোকান পাঠ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনা। এসব সরকারি খাস জায়গা এখনই উদ্ধার করা প্রয়োজন বলে স্থানীয়রা মনে করেন। নতুবা প্রতি বছর সরকার লক্ষ লক্ষ টাকার রাজস্ব হারাবে।
হাট-বাজার ইজারা:
জকিগঞ্জ উপজেলার হাট-বাজার ইজারা নিয়ে এবার ব্যাপক সমালোচনার মূখে পড়েছিলেন জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার। কতিপয় রাজনৈতিক দলের যোগসাজশে অতিতের তুলনায় অল্প মূল্যে হাট-বাজার ইজারা দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছেন। তদন্ত সাপেক্ষে এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা দরকার।
জলমহাল ইজারা:
জকিগঞ্জ উপজেলায় বেশ কয়েকটি জলমহাল রয়েছে। এসব জলমহাল ইজারা দিতে গিয়ে প্রতি বছর অনিয়মের খবর পাওয়া যায়। আগামী দিনে এসব জলমহাল যেন সম্পূর্ণ নিয়মানুযায়ী রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে ইজারা প্রদান করা হয়। সেই প্রত্যাশা এখন জকিগঞ্জবাসীর।
রহিমপুর পাম্প হাউস:
উপজেলার শরীফগঞ্জ এলাকায় প্রায় তিনশত কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত রহিমপুর পাম্প হাউস নির্মাণের পর থেকে বন্ধ রয়েছে। এতে জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, কানাইঘাট, গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ সহ বেশ কয়েকটি এলাকার মানুষ লাভের চেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রায় একযুগ থেকে। তাই অতিদ্রুত পাম্প হাউসটি চালু করা সময়ের দাবী।
কাস্টমস ঘাট:
জকিগঞ্জ কাস্টমস ঘাট নির্মাণ হচ্ছে হবে বলে দিনের পর দিন অতিবাহিত হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। কাস্টমস ঘাট না থাকায় আমদানি রপ্তানি করতে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। জীর্ণশীর্ণ একটি ঘরে যুগের পর যুগ চলছে জকিগঞ্জ শুষ্ক ষ্টেশনের কাজ। দীর্ঘদিন থেকে জকিগঞ্জবাসীর দাবী শুষ্ক ষ্টেশনের নতুন একটি ভবন নির্মাণের। কিন্তু আজ অবধি তা হচ্ছে না। অতি দ্রুত জকিগঞ্জ কাস্টমস ঘাট নির্মাণ ও শুষ্ক ষ্টেশনের ভবন নির্মাণের দাবি সংশ্লিষ্টদের।
তিন নদীর মোহনা:
জকিগঞ্জ উপজেলা বারঠাকুরী ইউনিয়নের আমলশীদ তিন নদীর মোহনাকে পর্যটন কেন্দ্র করার দাবী এ উপজেলার মানুষের দীর্ঘ দিনের। সেটাও সেই আশায় আশায় পড়ে আছে। এখনো কোন কার্যকর উদ্যোগ নিতে কাউকে দেখা যায়নি। বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেয়া খুবই প্রয়োজন।
বিনিময় মামলা জটিলতা;
সিলেটের সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এক সময় ঘন হিন্দু জনবসতি ছিল। ১৯৬৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে অনেক হিন্দু পরিবার বিনিময় দলিলের মাধ্যমে ভারতীয় মুসলমানদের সাথে জায়গা রদবদল করে পাকিস্তান ত্যাগ করে ভারতে গিয়ে বসবাস করছিল। ভারতে গিয়ে তারা তাদের সম্পত্তি ঠিকই বুঝে পেলেও বাংলাদেশে আসা মুসলমানরা আজও নিজের জায়গাগুলো বুঝে পায়নি। বাংলাদেশ সরকার তাদের এসব জায়গা অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় নিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানীতে ফেলে দেয়। পরবর্তীতে অর্পিত সম্পত্তি (খ) তালিকা বাতিল করে যার যার দলিল দিয়ে জায়গা নিজ নামে নামজারি করার কথা বলা হলেও বিনিময় দলীল দিয়ে নামজারি করে দিচ্ছেনা জকিগঞ্জ উপজেলা ভুমি অফিস। সঠিক কোন উত্তর না দিয়ে দিচ্ছি দেব বলে বছরের পর বছর কালক্ষেপন করছেন কর্তা ব্যক্তিরা। এতে চরম বিপাকে রয়েছেন জকিগঞ্জের হাজারো পরিবার। ভুক্তভোগী লোকজন এসব হয়রানী থেকে মুক্তি ও নিজ নিজ জায়গা নিজের নামে নামজারি’র দাবী জানান নতুন জেলা প্রশাসকের নিকট।
এছাড়াও নবাগত জেলা প্রশাসকের নিকট জকিগঞ্জ উপজেলার সার্বিক আবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আইনশৃংখলা উন্নয়নের প্রত্যাশা করেন জকিগঞ্জবাসী।
Leave a Reply