সিলেটের পূর্ব প্রান্তে জকিগঞ্জ উপজেলার ৩নং কাজলসার ইউনিয়নের অন্তর্গত আটগ্রাম এলাকার চারিগ্রামে দাঁড়িয়ে আছে এক সময়কার জমিদারি ঐতিহ্যের সাক্ষ্য—সাজিদ রাজার বাড়ি। প্রাচীন স্থাপত্য, ধর্মীয় নিদর্শন আর জনকল্যাণমূলক কাজের সমাহারে এই বাড়িটি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থানই নয়; বরং এটি স্থানীয় মানুষের হৃদয়ে গেঁথে থাকা এক স্মৃতিচিহ্ন।
জানা যায়, ১৮শ শতকের প্রথম দিকে জমিদার সাজিদ রাজা এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন। তিনি শুধু ক্ষমতাধর শাসকই ছিলেন না, ছিলেন জনগণের অভিভাবকও। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এখনো গ্রামীণ ইতিহাসে আলোচিত।
তাঁর নির্মিত প্রায় ১৫ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই প্রাসাদে ছিল বসবাসের জন্য একাধিক ভবন, অতিথিশালা ও নানা প্রকার আনুষঙ্গিক স্থাপনা। কলকাতা থেকে আনানো কারিগরদের দক্ষ হাতে নির্মিত এক অনন্য নিদর্শন হলো তেরোচালা টিনের ঘর, যা নির্মাণে খরচ হয়েছিল প্রায় ১৩ হাজার টাকা—সে সময়ে যা ছিল বিরাট অঙ্ক। কাঠ ও টিনের মিশেলে তৈরি এই ঘরটি আজও অক্ষত রয়েছে। এর ছাদের নকশা ও বায়ু চলাচলের সুবিধাজনক কাঠামো স্থপতিদের সৃজনশীলতার প্রমাণ।
বাড়ির সম্মুখভাগে রয়েছে একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। ১৭৪০ সালে নির্মিত মসজিদটি এখনো ব্যবহারযোগ্য। দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ, পিলার ও সিঁড়ি সমৃদ্ধ এই মসজিদ এলাকার মুসল্লি ও দর্শনার্থীদের কাছে আধ্যাত্মিক প্রশান্তির স্থান। মসজিদের সামনেই রয়েছে বিশাল একটি দীঘি। প্রায় ৮ একর জমি খনন করে তৈরি করা হয় বিশাল এই দীঘি, যা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের দৈনন্দিন ব্যবহার ও খাবার পানির চাহিদা মেটাচ্ছে। এছাড়া কারুকাজ রচিত এক সময়কার প্রাসাদ ভবনটি আজ ভগ্নপ্রায় হলেও এর স্থাপত্যের অবশিষ্টাংশ অতীতের জাঁকজমকের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
এসকল স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শনগুলির মধ্যে বর্তমানে প্রাসাদের বড় অংশ ভগ্নপ্রায় হলেও মসজিদ এবং কাঠ ও টিন দিয়ে নির্মিত তেরোচালা ঘরটি এখনও অটলভাবে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টিনন্দন এই ঘরটিতে বিচারকার্য পরিচালনা করা হতো। স্থানীয়রা মসজিদে নামাজ আদায় করেন, আর দর্শনার্থীরা ইতিহাসের গন্ধ খুঁজে পান প্রাসাদের প্রতিটি ইট ও কাঠে।
স্থানীয়দের কণ্ঠে এখনো শুনা যায় ঐতিহ্যের গল্প। গ্রামের প্রবীণরা এখনো সাজিদ রাজার ন্যায়পরায়ণতার কথা বলেন। দীঘিতে গোসল করতে আসা স্থানীয় প্রবীণ রফিক মিয়া বলেন— “সাজিদ রাজা শুধু জমিদার নায়, তাইন আছলা প্রজার অভিভাবক, ন্যায়বিচারে খুব কঠোর এক শাসক। রাজার তৈরি এই দীঘি মানুষর জীবন বাঁচাইছে খরার মৌসুমো। এখনো আমরা এই দীঘিত ওযু-গোসল করি, প্রতিদিন বেটিনতে কলসি দিয়া খাইবার পানি নেইন।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে সাজিদ রাজার বাড়ি পর্যটন শিল্পে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। এতে শুধু ইতিহাস সংরক্ষণই নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাড়িটি আজো স্মরণ করিয়ে দেয় বাংলার জমিদারি যুগের ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির মহিমা। এটি শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো এক অমূল্য ঐতিহ্য।
Leave a Reply