সিলেটকে ঘিরে সরকারের উন্নয়ন মহাপরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সিলেট-ঢাকা সড়কপথ, রেলপথ, স্বাস্থ্য ও শিল্পায়নের লক্ষ্যে গৃহীত উন্নয়ন পদক্ষেপসমূহ বিস্তারিত তুলে ধরেন।
শনিবার (২ মে) প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম সিলেট সফরে এসে এ কথা জানিয়েছেন তিনি। প্রতিকূল আবহাওয়ায় মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেই হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে প্রবেশ করেন। এ সময় সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান তার সঙ্গে ছিলেন। সকাল ১০টা পাঁচ মিনিটের দিকে তিনি সিলেটে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এরপর বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্বোধন শেষে নগর ভবনে আয়োজিত সুধী সমাবেশে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী।
নির্বাচনী প্রচারণার স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনের আগে আমি যখন সিলেটে এসেছিলাম তখন বলেছিলাম, সিলেট থেকে লন্ডন যেতে ৯ থেকে সাড়ে ৯ ঘণ্টা সময় লাগে। অথচ সিলেট থেকে সড়কপথে ঢাকা যেতে সময় লাগে ১০ ঘণ্টা। তাই আমি সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম।’
তিনি বলেন, সরকার গঠনের পর আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক সম্প্রসারণ কাজের জমি অধিগ্রহণে ১১টি জায়গায় সমস্যা ছিল। একারণে কাজ আটকে ছিল। এই সমস্যাগুলো ইতোমধ্যে দূর করা হয়েছে। আমরা আশা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করতে পারব। কাজ শেষ হতে হয়তো দেরি হবে, তবে শুরু হলে তো একদিন শেষও হবে। এতে মানুষের যাতায়াতের কষ্ট লাঘব হবে।
কেবল সড়কপথ নয়, রেল যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাস্তা যত বড় করা হবে তত গাড়ি নামবে এবং ট্রাফিক জ্যাম বাড়বে। এতে ফসলি জমিও নষ্ট হয়। তাই আমাদের রেলের উন্নয়ন করতে হবে। আমরা ঢাকা-সিলেট রেলপথকে ডাবল লাইনে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।
সিলেটের স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, সিলেটে বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা ২০০ শয্যার হাসপাতালটি দ্রুত চালু করা হবে। এছাড়া সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ১২০০ শয্যায় উন্নীত করার প্রচেষ্টা চলছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে সরকার ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করবে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, “এই স্বাস্থ্যকর্মীদের ৮০ শতাংশই হবেন নারী। তারা গ্রামে গ্রামে মানুষের বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে সচেতন করবেন। কোন খাবার বেশি খেলে কোন রোগ হয়, এসব বিষয়ে মানুষকে অবগত করবেন।”
বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যত দ্রুত সম্ভব বন্ধ কারখানাগুলো চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি। প্রয়োজনে প্রাইভেট খাতে ছেড়ে দিয়ে হলেও এগুলো সচল করা হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে। আমরা বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করারও চেষ্টা করছি।”
সিলেটের আইটি পার্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সিলেটে একটি আইটি পার্ক আছে কিন্তু সেটি সচল নেই। আমরা এটি দ্রুত সচল করার চেষ্টা করছি যাতে তরুণরা এখানে কাজের সুযোগ পায়। এছাড়া দেশের ভোকেশনাল সেন্টারগুলো আপডেট করার উদ্যোগও নিয়েছে সরকার।”
সিলেটের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, “এয়ারপোর্ট থেকে আসার সময় দেখছিলাম বৃষ্টির কারণে পানি জমে গেছে। বৃষ্টির কারণে সুনামগঞ্জের অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এছাড়া সব নগরেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য হুমকি। এজন্য আমরা খাল খনন কর্মসূচি নিয়েছি। এতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা যাবে এবং জলাবদ্ধতাও নিরসন হবে।”
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে সুরমা তীরের মেগা প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “একটু আগে যে প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলাম, এটি বাস্তবায়ন হলে সিলেটে আর জলাবদ্ধতা থাকবে না।” পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “নদীতে প্লাস্টিকের স্তর জমে পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে। এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। সিটি করপোরেশন এলাকার স্কুলগুলোতে শিশুদের পরিবেশ বিষয়ে সচেতন করার উদ্যোগ নিতে হবে।”
জনগণের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা প্রতিশ্রুতি রক্ষা শুরু করেছি। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালু করা হয়েছে। শিশুদের খেলাধুলায় আকৃষ্ট করতে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচি চালু করেছি।”
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, হুইপ জিকে গউছ এবং সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার।
Leave a Reply