কুশিয়ারা নদীর দুই তীরে দুই দেশ, মাঝখানে সীমান্তরেখা। অথচ ধর্মীয় উৎসবের আনন্দে যেন সেই সীমান্তও হয়ে ওঠে সম্প্রীতির সেতু। বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের মিলন, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের আবহে সিলেটের জকিগঞ্জে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়েছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে জকিগঞ্জ পৌর এলাকার কাস্টমঘাটে কুশিয়ারা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে দুই দেশের নদীতীরে জড়ো হন হাজারো মানুষ। ঢাকঢোল, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও ভক্তদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে সীমান্তবর্তী জনপদ। বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে শোভাযাত্রা নিয়ে কাস্টমঘাটে আসেন পূজার্থীরা। শেষবারের মতো তেল-সিঁদুর, ধান-দূর্বা ও মিষ্টি নিবেদন করে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান তাঁরা। মণ্ডপে মণ্ডপে চলে সিঁদুর খেলা ও নানা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা।
বিসর্জন ঘিরে বাংলাদেশের জকিগঞ্জের কাস্টমঘাট এবং ভারতের করিমগঞ্জের কাস্টমঘাট-সংলগ্ন অখণ্ড মণ্ডলী মন্দির এলাকায় সৃষ্টি হয় মিলনমেলার। কুশিয়ারা নদীর এপার-ওপারে দাঁড়িয়ে দুই দেশের মানুষ উপভোগ করেন বিসর্জনের আয়োজন। স্থানীয়দের মতে, অর্ধশতাব্দি ধরে চলে আসা এ ঐতিহ্য সীমান্তের দুই পাশের মানুষের মধ্যে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করছে।
বিসর্জন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক সঞ্জিত চক্রবর্তী পান্না ও উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি হীরালাল বিশ্বাস সভাপতিত্ব করেন। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বিনয় ভূষণ দাস ও পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সেক্রেটারি সুরঞ্জিত কুমার রায় অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজিত কুমার চন্দ। বিশেষ অতিথি ছিলেন জকিগঞ্জ চৌকি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহিম সরকার ও জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য দেন উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি ইকবাল আহমদ, সিলেট জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুর রহমান, জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসান আহমদ, পৌর বিএনপির সভাপতি মাসুক আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক শিব্বির আহমদ রনি। এ ছাড়া বক্তব্য দেন সিলেট জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সদস্য সত্যজিৎ দত্ত পুরকায়স্থ, উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সহসভাপতি নিহার রায় এবং পূজা উদযাপন ফ্রন্টের যুগ্ম আহ্বায়ক তাপস বিশ্বাস।
বক্তব্যে বিএনপি নেতারা তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ‘তারেক রহমানের সরকার বারবার দরকার। কেননা প্রতিটি পূজামণ্ডপে চালের বরাদ্দ আগের তুলনায় ১০০ কেজি বাড়িয়ে ৬০০ কেজি করা হয়েছে। পূজার সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের অনুদান চার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ কোটি টাকা করার বিষয়টিও তাঁরা উল্লেখ করেন।
বক্তারা বলেন, ২০২৬ সালে গত কয়েক বছরের তুলনায় দুর্গাপূজার আয়োজন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তাঁরা জকিগঞ্জের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য তুলে ধরে নির্বিঘ্নে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হওয়ায় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
বিসর্জন নির্বিঘ্ন রাখতে পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, ডিবি পুলিশ, বিজিবি, আনসার সদস্য ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল সতর্ক অবস্থানে ছিল। ভারতের করিমগঞ্জেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা দেখা যায়।
উল্লেখ্য, এ বছর সিলেট জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ ৯৫টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব উদ্যাপিত হয়েছে জকিগঞ্জ উপজেলায়। কুশিয়ারা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে দুই দেশের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আবারও তুলে ধরেছে সীমান্তের ঊর্ধ্বে মানবিক বন্ধন, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের অনন্য দৃষ্টান্ত।
Leave a Reply