এক বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিলেন সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার কালিগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী নুমান উদ্দিন। দুই দিন পর বাড়ির কাছাকাছি একটি ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হয় তাঁর লাশ। এরপর হত্যা মামলা, শ্যালককে গ্রেপ্তার করে রিমান্ড, নানা অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং তদন্তের দায়িত্ব থানা পুলিশ থেকে সিআইডিতে হস্তান্তর—সবই হয়েছে। শুধু এক বছরেও মেলেনি নুমান হত্যার সুনির্দিষ্ট রহস্য। কারা তাঁকে হত্যা করেছে, কোথায় হত্যা করা হয়েছে এবং হত্যার পেছনে কারণই বা কী—এসব প্রশ্ন এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে।
ময়নাতদন্তে নুমানের মাথায় আঘাত ও মস্তিষ্কের ডান পারিয়েটাল অংশে প্রায় ১৫০ সিসি সাবডুরাল হেমাটোমা পাওয়া যায়। চিকিৎসকের চূড়ান্ত মতামতে মাথায় আঘাতজনিত সাবডুরাল হেমাটোমা ও শকের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে এবং মৃত্যুর ধরন ‘হোমিসাইডাল ইন নেচার’ বলে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ চিকিৎসকের মতামত অনুযায়ী নুমানের মৃত্যু হত্যাজনিত। কিন্তু হত্যার সঙ্গে কারা জড়িত, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
জানা যায়, নুমান উদ্দিন জকিগঞ্জ উপজেলার ৯ নম্বর মানিকপুর ইউনিয়নের পূর্ব মানিকপুর গ্রামের মৃত আব্দুল জব্বারের ছেলে। দীর্ঘদিন সৌদি আরবে থাকার পর দেশে ফিরে কালিগঞ্জ বাজারে সুপারি ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন নুমান। এরপর আর বাড়ি ফেরেননি। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পরদিনও তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি। ১ অক্টোবর বিকেলে শায়লা স্মৃতি হাসপাতালের পেছনের ধানক্ষেত থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়।
পরে নিহতের বড় মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মুন্নি জকিগঞ্জ থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। লাশ উদ্ধারের পর হত্যার বিচার ও জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে কালিগঞ্জ বাজারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশও হয়।
এরপর মামলার তদন্ত শুরু করে জকিগঞ্জ থানা পুলিশ। তদন্তের একপর্যায়ে নিহতের শ্যালক হানিফ উদ্দিন সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালত তাঁকে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তখন নুমান উদ্দিনের সঙ্গে সুমনের পারিবারিক ও সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি তদন্তে আসার কথা জানা যায়। রিমান্ডে পুলিশ কিছু তথ্য পেয়েছে বলেও দাবি করেছিল। তবে কী তথ্য পাওয়া গিয়েছিল এবং তার ভিত্তিতে তদন্ত কোন দিকে এগিয়েছিল—তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হয়নি।
পরে মামলার বাদী তদন্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালতের শরণাপন্ন হন। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তর করা হয়। ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি সিআইডি মামলাটির তদন্তভার নেয়।
কিন্তু সিআইডির দীর্ঘ প্রায় ৯ মাসের তদন্তেও এখন পর্যন্ত হত্যার রহস্য উদঘাটন বা জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের কোনো চূড়ান্ত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
নিহতের শ্যালক হানিফ উদ্দিন সুমন শুরু থেকেই নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন। তিনি বলেন, “সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পিতভাবে আমাকে গ্রেপ্তার করানো হয়েছে।”
সুমনের ভাষ্য, নুমান নিখোঁজ হওয়ার পর তিনি নির্ঘুম অবস্থায় তাঁকে খুঁজেছেন। তখন নুমানের আপন ভাইসহ কেউই খোঁজ নেননি। কিন্তু লাশ উদ্ধারের পরপরই নুমানের ভাই রিয়াজসহ প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁদের বাড়িতে গিয়ে বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে জনসাধারণের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি করে হামলা ও মারধরের মাধ্যমে ঘটনাকে ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেন।
সুমনের দাবি, তিনি মামলার সাক্ষী হওয়া সত্ত্বেও পুলিশের সঙ্গে আতাত করে তাঁকে আসামি করা হয়। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। তাঁর ভাষায়, “আমি নির্দোষ থাকায় ঘটনার সাথে আমার কোন সম্পৃক্ততা পায়নি। বরং অপর পক্ষ আমার বিরুদ্ধে যা যা মিথ্যা তথ্য রটিয়েছিল, তা কাগজপত্রের মাধ্যমে মিথ্যা প্রমাণ করেছি এবং এখনো করতে সক্ষম। তবুও পুলিশ জনগণের মাঝে সৃষ্ট ক্ষোভ নিবারণে আমাকে বিনা কারণে দোষী বানিয়েছে”।
তাঁর অভিযোগ, তাঁকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে নুমান হত্যার ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। নুমানের কোনো ছেলে সন্তান না থাকায় তাঁর দুই মেয়ের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে একটি পক্ষ পরিস্থিতি ঘোলাটে করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সুমন আরও বলেন, জকিগঞ্জ থানার তৎকালীন ওসি মুন্নার মাধ্যমে মামলার বাদী তাঁর ভাগনি জান্নাতুল ফেরদৌস মুন্নিকে গণমাধ্যমে কথা বলা থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, এর সুযোগ নিয়ে নুমান উদ্দিনের পরিবারকে মানুষের কাছে খারাপভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সুমনের প্রশ্ন, “এত এত রহস্য থাকা সত্ত্বেও সিআইডি এখনো কেন এ মামলার আসামিদের ধরতে পারেনি এবং ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি?”
মামলার বাদী জান্নাতুল ফেরদৌস মুন্নির বক্তব্য অনুযায়ী, নুমান উদ্দিনের সঙ্গে প্রতিবেশী শাহ আলম, চাচি রাবেয়া বেগম, চাচা রিয়াজ উদ্দিন, দূরসম্পর্কের চাচা আল আমিন, আব্দুস সামাদ, জামিল আহমদ ও কবির আহমদের জায়গা-জমি নিয়ে বিরোধ ছিল।
এ ছাড়া প্রতিবেশী নিজাম উদ্দিন, বদরুল ইসলাম বুদুর মিয়া ও তেরা মিয়াকে গভীরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
মুন্নির দাবি, ঘটনার একদিন পর তাঁদের সন্দেহভাজন জামিল প্রবাসে পালিয়ে যান। তাঁর আরও দাবি, সন্দেহভাজন শাহ আলমও নিজের ব্যবসা গুটিয়ে পালিয়ে রয়েছেন।
বাদীর অভিযোগে অভিযুক্ত রিয়াজ উদ্দিনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর স্ত্রী রাবেয়া বেগম বলেন, “নিহতের শ্যালক সুমন অপরাধী না হলে পুলিশ কেন ধরে নিয়ে গিয়েছিল?” তিনি এ ঘটনায় সুমনকেই দায়ী করেন। একই সঙ্গে শাহ আলম পলাতক নন বলেও জানান তিনি। এর বাইরে আর কোনো বক্তব্য দিতে চাননি রাবেয়া।
নিহত নুমানের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম জানান, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তাঁদের পুরোনো বাড়ির জায়গা নিয়ে বিরোধ ও মামলা চলছিল। এ নিয়ে নুমান আগেও স্থানীয় মসজিদে হামলার শিকার হয়েছিলেন। পরে কালিগঞ্জ বাজারেও তাঁর ওপর হামলা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
মনোয়ারার ভাষ্য, নুমান নিখোঁজ হওয়ার পরদিন ওই মামলার তারিখ অনুযায়ী তাঁর সিলেটে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার কারণে তিনি যেতে পারেননি।
নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতের একটি ঘটনাকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন মনোয়ারা। তাঁর দাবি, স্থানীয় একটি দোকানে বিস্কুট কেনাকে কেন্দ্র করে নুমানের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি ও ঝগড়া হয় স্থানীয় এক দোকানদারের। পরে বদরুল ইসলাম বুদুর মিয়া নামে এক ব্যক্তি নুমানকে একাধিকবার ফোন করেন। ওই ঘটনা নিয়ে পরদিন মীমাংসা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওইদিনই নুমান নিখোঁজ হন।
পরিবারের পক্ষ থেকে ওই ঘটনাটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
নুমানের লাশ উদ্ধার করা হয় শায়লা স্মৃতি হাসপাতালের পেছনের ধানক্ষেত থেকে। হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকাটি নির্জন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
নুমানের স্ত্রী মনোয়ারা বেগমের ধারণা, হত্যাকাণ্ডটি শায়লা হাসপাতালের নির্জন এলাকায় ঘটতে পারে। তিনি হাসপাতালের কেয়ারটেকার তেরা মিয়াকে গভীরভাবে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
মামলার বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক সালেক আহমদ বলেন, “তদন্ত অনেক দূর এগিয়ে গেছে। খুব কম সময়ের ভিতরে ভালো কোনো রিজাল্ট পেয়ে যাবেন।”
তবে সিআইডি সিলেটের বিশেষ পুলিশ সুপার এহতেশামুল হক বলেন, “এই মামলার খুব একটা অগ্রগতি আমরা এখনো দেখছি না। তবে মামলার রহস্য উদঘাটনে চেষ্টা চলছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তারপরও কিছু পাওয়া না গেলে আমরা ছেড়ে দেব।”
এদিকে নুমান উদ্দিন ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর কোথায় গিয়েছিলেন? তাঁর সঙ্গে সর্বশেষ কার কার যোগাযোগ হয়েছিল? তাঁকে কি কেউ পরিকল্পিতভাবে কোনো স্থানে নিয়ে গিয়েছিল? শায়লা হাসপাতালের পেছনের ধানক্ষেতেই কি হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, নাকি অন্য কোথাও হত্যার পর সেখানে মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছিল?
মাথায় আঘাতটি কোথায় ও কীভাবে করা হয়েছিল? হত্যার পেছনে পুরোনো বাড়ির বিরোধ, নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতের ঝগড়া, নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—হানিফ উদ্দিন সুমনকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে পুলিশ কী তথ্য পেয়েছিল? সেই তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত পরে কোন দিকে এগিয়েছিল?
এক বছর পেরিয়ে গেলেও এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর মেলেনি।
ময়নাতদন্তে নুমানের মৃত্যু হত্যাজনিত বলে মতামত দেওয়া হয়েছে। এখন পরিবারের প্রত্যাশা, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে আলামত ও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত শেষ করে প্রকৃত ঘটনা এবং জড়িত ব্যক্তিদের সামনে আনা হোক।
এক বছর ধরে নুমান উদ্দিনের পরিবার অপেক্ষায়—হত্যার রহস্য কবে খুলবে, আর কবে মিলবে তাঁদের স্বজন হত্যার বিচার।
Leave a Reply